ওযুর ফরজ কয়টি ও কী কী
ওযুর ফরজ কয়টি ও কী কী
ওযূর ফরয চারটি যা আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআন মাজীদে ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করেছেন। তা হল :
১. সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল ধৌত করা
আল্লাহ তা’আলা বলেন, হে মুমিনগণ! যখন তোমরা ছালাতে দণ্ডায়মান হতে চাও, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ধৌত কর’ (মায়েদা ৫/৬)।
কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়া মুখমণ্ডলের অন্তর্ভুক্ত। অতএব কেউ যদি মুখমণ্ডল ধৌত করে কিন্তু কুলি না করে অথবা নাকে পানি না দেয়, তাহলে তার ওযূ ছহীহ হবে না। কারণ আল্লাহ তা’আলা সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল ধোয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আর কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়া মুখমণ্ডল ধোয়ার অন্তর্ভুক্ত।
ছালেহ আল-ফাউযান, আল-মুলাক্ষাছুল ফিকহী ১/৪১ পৃঃ; আল-ফিকহুল মুয়াস্সার ১৮ পৃঃ।
২. উভয় হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করা
আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা তোমাদের হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত কর। (মায়েদা ৫/৬)। এখানে কনুই পর্যন্ত বলতে কনুই সহ ধৌত করার কথা বলা হয়েছে।
জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন ওযূ করতেন তখন তাঁর দুই কনুইয়ের উপর পানি ঢেলে দিতেন।
দারাকুতনী হা/২৮০; সিলসিলা ছহীহা হা/২০৬৭।
অন্য হাদীছে এসেছে
নু‘আঈম ইবনে আব্দুল্লাহ আল-মুজমির (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হুরায়রাহ (রাঃ)-কে ওযূ করতে দেখেছি। তিনি খুব ভালভাবে মুখমণ্ডল ধৌত করলেন, এরপর ডান হাত বাহুর কিছু অংশসহ ধৌত করলেন। পরে বাম হাতও বাহুর কিছু অংশসহ ধৌত করলেন। এরপর মাথা মাসাহ করলেন। অতঃপর ডান পায়ের নলার কিছু অংশসহ ধৌত করলেন। তারপর বাম পায়ের নলার কিছু অংশসহ ধৌত করলেন। অতঃপর বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)- কে এভাবে ওযূ করতে দেখেছি।
মুসলিম হা/২৪৬, ‘ওযূর সময় মুখমণ্ডল, কনুই ও পায়ের টাখনুর বাইরে একটু বেশী করে ধোয়া উত্তম’ অনুচ্ছেদ।
এ হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয় যে, উভয় হাতের কনুই ও পায়ের গোড়ালী সহ ধৌত করতে হবে।
৩. সম্পূর্ণ মাথা মাসাহ করা
আল্লাহ তা’আলা বলেন, তোমরা তোমাদের মাথা মাসাহ কর। (মায়েদা ৫/৬)।
এখানে মাথা মাসাহ বলতে সম্পূর্ণ মাথা মাসাহ করার কথা বলা হয়েছে। অতএব মাথার কিছু অংশ মাসাহ করা বৈধ নয়। হাদীছে এসেছে,
অতঃপর তিনি দু’হাত দিয়ে মাথা মাসাহ করলেন। অর্থাৎ হাত দু’টি সামনে এবং পেছনে নিলেন। মাথার সম্মুখভাগ থেকে শুরু করে উভয় হাত পেছনের চুলের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত নিলেন। তারপর আবার যেখান থেকে শুরু করেছিলেন, সেখানেই ফিরিয়ে আনলেন।
বুখারী হা/১৮৫, ‘ওযূ’ অধ্যায়, ‘পূর্ণ মাথা মাসাহ করা’ অনুচ্ছেদ, বঙ্গানুবাদ (তাওহীদ পাবলিকেশন্স) ১/১০৭ পৃঃ; মুসলিম হা/২৩৫; মিশকাত হা/৩৯৩, বঙ্গানুবাদ (এমদাদিয়া) ২/৭৮ পৃঃ।
মাথা মাসাহ করার সাথে একই পানি দিয়ে কান মাসাহ করতে হবে। কারণ কান মাথার অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, কানদ্বয় মাথার অংশ।
ইবনু মাজাহ হা/৪৪৩; আবুদাউদ হা/১৩৪; সিলসিলা ছহীহা হা/৩৬; ইরওয়াউল গালীল হা/৮৪।
অতএব যেহেতু কান মাথার অংশ সেহেতু মাথার সাথে কান মাসাহ করাও ফরয।
৪. টাখনু পর্যন্ত উভয় পা ধৌত করা
আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা তোমাদের পা টাখনু পর্যন্ত ধৌত কর। (মায়েদা ৫/৬)।
এখানে টাখনু পর্যন্ত বলতে টাখনুসহ ধৌত করা বুঝানো হয়েছে। যেমন পূর্বোক্ত হাদীছ- আবু হুরায়রাহ ডান পায়ের নলার কিছু অংশসহ ধৌত করলেন।
অতঃপর বাম পায়ের নলার কিছু অংশসহ ধৌত করলেন। এরপর বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে এভাবে ওযূ করতে দেখেছি।
মুসলিম হা/২৪৬
উপরিউক্ত ওযূর চারটি ফরয ছাড়াও আরো দু’টি কাজ অপরিহার্য
এমনকি ফকীহগণের অনেকেই এ দু’টিকেও ফরযের মধ্যে গণ্য করেছেন।
মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন, শারহুল মুমতে ১/১৮৩ পৃঃ; ছালেহ আল-ফাউযান, আল- মুলাক্ষাছুল ফিকহী ১/৪১ পৃ।
তবে এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
১. ওযূ করার সময় ধারাবাহিকতা রক্ষা করা
অর্থাৎ প্রথমে মুখমণ্ডল, তারপর দুই হাত ধৌত করা, অতঃপর মাথা মাসাহ করা এবং শেষে দুই পা ধৌত করা। যেভাবে পবিত্র কুরআনে এসেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, হে মুমিনগণ! যখন তোমরা ছালাতে দণ্ডায়মান হতে চাও, তখন তোমাদের মুখ ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর, মাথা মাসাহ কর এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধৌত কর’ (মায়েদা ৫/৬)।
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা’আলা ওযূর যে ধারাবাহিকতা বর্ণনা করেছেন তা বজায় রাখা অপরিহার্য। কেননা আল্লাহ তা’আলা কনুই পর্যন্ত হাত এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধৌত করার মাঝখানে মাথা মাসাহ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যদি ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অপরিহার্য না হত, তাহলে তিনি হাত ও পা ধৌত করার মাঝখানে মাথা মাসাহ করার নির্দেশ দিতেন না। হয় মাথা মাসাহ করার নির্দেশ ধৌত করা অঙ্গ সমূহের আগে বা পরে দিতেন। এছাড়াও ওযূর পদ্ধতি সম্পর্কিত প্রত্যেক হাদীছেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে।
মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন, শারহুল মুমতে ১/১৮৯-১৯০ পৃঃ।
অতএব মুখমণ্ডলের পূর্বে হাত কিংবা হাতের পূর্বে পা ধৌত করলে ওযূ ছহীহ হবে না।
২. ওযূ করার সময় এক অঙ্গ শুকানোর পূর্বেই অপর অঙ্গ ধৌত করা
খালিদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর কতিপয় ছাহাবী সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এক ব্যক্তিকে দেখলেন যে, তিনি ছালাত আদায় করছেন, কিন্তু তার পায়ের পাতায় এক দিরহাম পরিমাণ জায়গা শুকনো দেখতে পেলেন, যেখানে পানি পৌঁছেনি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে পুনরায় ওযূ করে ছালাত আদায় করার নির্দেশ দিলেন।
আবু দাউদ হা/১৭৫; আলবানী, সনদ ছহীহ, ইরওয়াউল গালীল ১/১২৭।
অত্র হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এক অঙ্গ শুকানোর পূর্বেই অপর অঙ্গ ধৌত করা অপরিহার্য। যদি অপরিহার্য না হত তাহলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হাদীছে উল্লেখিত ব্যক্তিকে পুনরায় ওযূ করে ছালাত আদায় করার নির্দেশ দিতেন না। বরং তার পায়ের যতুটুকু জায়গা শুকনো ছিল ততটুকুই ধৌত করার নির্দেশ দিতেন। কিন্তু যেহেতু তার অন্যান্য অঙ্গ শুকিয়ে গিয়েছিল সেহেতু তাকে পুনরায় অযু করার নির্দেশ দিয়েছেন।

Post a Comment