Header Ads

imran

ক্ষুদ্র ঋণের বোঝা থেকে রেহাই পেতে শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিক্রি করে দিচ্ছে বাংলাদেশের গরীব মানুষ

ক্ষুদ্র ঋণের বোঝা থেকে রেহাই পেতে শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিক্রি করে দিচ্ছে বাংলাদেশের গরীব মানুষ

 

ভূমিকাঃ বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থার উপর আলোকপাত করে বিবিসি একটি রিপোর্ট তৈরি করেছে, আমার ব্লগের পাঠকদের জন্য রিপোর্টটির বাংলা অনুবাদ এখানে দেওয়া হল।

মূল রিপোর্টঃ

প্রথম দর্শনে কালাই গ্রামটিকে বাংলাদেশের আর দশটি সাধারণ গ্রামের চেয়ে আলাদা কিছু মনে হবে না, কিন্তু আপনি আঁতকে উঠবেন যখন জানবেন যে এই গ্রামের ই কিছু মানুষ ক্ষুদ্র ঋণের বোঝা থেকে রেহাই পেতে শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিক্রি করে দিচ্ছে। অথচ ক্ষুদ্র ঋণ যেখানে হওয়ার কথা ছিলো তাদের দারিদ্রতা মুক্তির হাতিয়ার। ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থার এক ভয়ংকর পরিণতি আমাদের সামনে তুলে আনছেন সোফি কাজিনস।

ঢাকা থেকে ৬ ঘন্টা উত্তরে জয়পুরহাট জেলার এক সাধারণ গ্রাম কালাই। বাংলাদেশের অন্যান্য গ্রামের মতই চেহারা, ধানক্ষেতের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা, রাস্তায় ছোট বাচ্চাদের খেলা, যারা বাঁশের বেড়ার তৈরি কুঁড়েঘরে জীবন কাটায়।

লাখ লাখ দরিদ্র বাংলাদেশীর মতই তাদের জীবন মানে কঠিন সংগ্রাম, দারিদ্রতার হাত থেকে রক্ষা পেতে অগণিত মানুষ ক্ষুদ্র ঋণ নিয়েছেন এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে তাদের অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে। কেউ কেউ এই করুণ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে নিজ শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিক্রি করে দিয়েছেন।

শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন কিছু না হলেও সাম্প্রতিক কালে ক্ষুদ্র ঋণের জাল এ জড়িয়ে পড়া অনেকে এ থেকে মুক্তি পেতে এই পথ বেছে নেয়া শুরু করেছেন।

যদিও ঋণদাতারা প্রচার করেন যে তাদের উদ্দেশ্য হল দারিদ্রতা বিমোচন, যাতে করে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে দরিদ্র মানুষ স্বাবলম্বী হতে পারে, নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয়, কিন্তু বাস্তবতা আসলে ভিন্ন।

কিডনি বিক্রিঃ

মোঃ আখতার আলম (৩৩), তাঁর পেটে ১৫ ইঞ্চি দীর্ঘ একটি ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন, যেখান থেকে তাঁর একটি কিডনি কেটে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে শারীরিক অঙ্গ প্রদান নিষিদ্ধ, যদি না তা পরিবারের কোন সদস্যকে দান করা হয়। হতভাগ্য এই মানুষটি কিডনি বিক্রির পর পর্যাপ্ত চিকিৎসাও পান নি, যার ফলে বর্তমানে তাঁর শরীরের কিছু অংশ প্যারালাইজড, এক চোখ নষ্ট এবং তিনি ভারী কোন কাজ করতে আর সমর্থ নন। জীবিকা নির্বাহ করতে তিনি এখন গ্রামে একটি ছোট মুদি দোকান চালান।

দুই বছর আগে আলম সাহেব রিক্সা ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সেইসময় তিনি ৭ থেকে ৮টি এনজিওর কাছ থেকে প্রায় ১ লাখ টাকা ঋণ নেন। এটি ছিলো একপ্রকার জালের মত, যা তাঁকে আটকে ফেলে। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে এক এন জি ওর ঋণ শোধ করতে তাঁকে আরেক এন জি ওর কাছে যেতে হয় ঋণ নিতে।

এইসময়, তাঁর ভ্যানের এক যাত্রীর সাথে তাঁর পরিচয় হয়। এই যাত্রী শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বেচাকেনার দালাল হিসেবে কাজ করতো। সে আলম সাহেবকে লোভ দেখায় যে একটা কিডনি বিক্রি করলে তিনি ৪ লাখ টাকা পাবেন।

১৭ দিন পরে অর্ধমৃত আলম সাহেব ঢাকার একটি বেসরকারি হসপিটাল থেকে ফিরে আসেন, সামান্য কিছু টাকা দিয়ে তাঁকে বিদায় করে দেওয়া হয়।

‘’আমি কিডনি বিক্রি করতে রাজি হয়েছিলাম কারণ এন জি ওর টাকা ফের দেওয়ার আর কোন উপায় ছিলো না আমার হাতে, আমরা গরীব, কেউ আমাদের সাহায্য করে না’’- বলেন তিনি।

কালাই গ্রামের মোঃ মোকারম হোসেন এরকম আরেক শিকার।

‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সব ঋণ শোধ করে দিবো’- জানান তিনি। কথা বলার সময় তিনি তাঁর ক্ষতচিহ্ন বের করে দেখান, ভারতে কিডনি অপারেশনের সময় যা সৃষ্টি হয়েছে তাঁর শরীরে।

‘ডাক্তার বলেছিলেন যে এতে কোন ঝুঁকি নেই, কিন্তু বর্তমানে আমি কোন কাজ ই করতে পারি না’- বলেন তিনি।

ঋণের পরিমাণ কত?

লাখো মানুষের দারিদ্রতা দূরীকরণে ক্ষুদ্রঋণের ভূমিকা সারাবিশ্বে ব্যাপক প্রশংসিত হলেও এর নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা তেমন হয় না বললেই চলে।

এই ব্যবস্থায়, এক এন জি ওর ঋণ শোধ করতে আরেক এন জি ও থেকে ঋণ নিয়ে মানুষ ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে, এবং অনেকে অনন্যপায় হয়ে অঙ্গ বিক্রির মত কাজে বাধ্য হচ্ছে।

মিশিগান ইউনিভার্সিটির অ্যানথ্রোপোলজি বিভাগের প্রফেসর মনির মনিরুজ্জামান ১২ বছর ধরে বাংলাদেশে মানব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ব্যবসার উপর গবেষণা করে আসছেন। তিনি বলেন, ‘কিছু মানুষ মনে করে শরীরের অঙ্গ বিক্রি করা ছাড়া তাদের আর কোন উপায় নেই। প্রচুর সংখ্যক মানুষের ঋণ এর বোঝা এত বেশী হয়ে গেছে যে তারা মনে করে তাদের হাতে একটাই উপায় আছে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার আর তা হল কিডনি বিক্রি করে দেওয়া’।

তাঁর গবেষণায় বেরিয়ে আসে- কিডনি বিক্রি করেছেন এমন ৩৩ জনের মধ্যে কয়েকজন তাঁদের কিডনি বিক্রি করেছেন কারণ তারা ঋণ পরিশোধ করতে চাপের মধ্যে ছিলেন।

তিনি অভিযোগ করেন- গ্রামীন ব্যাংক, ব্র্যাক এর মত এন জি ওর কর্মকর্তারা ঋণ গ্রহীতার বাসায় সারাদিন বসে থেকে তাঁদের হুমকি দিয়ে বা পুলিশের কাছে অভিযোগ দেয়ার ভয় দেখিয়ে ঋণ শোধের জন্য চাপ প্রদান করে থাকেন।

তিনি জানান, একজন কিডনি বিক্রেতা তাঁর গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয় ঋণ শোধ করতে না পারায়। এন জি ও গুলোর সামাজিক এবং অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করতে না পেরে তিনি কিডনি বিক্রি করে ঋণমুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

যদিও গ্রামীন ব্যাংক ঋণ গ্রহীতার উপর কোন ধরনের চাপ সৃষ্টির অভিযোগ অস্বীকার করে। তারা দাবি করেন যে তারা কোন ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে কখনো মামলা করেন নি।

গ্রামীন ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোঃ শাহজাহান বিবিসিকে বলেন, ‘গ্রামীন ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে দেরি হলে তার জন্য কোন জরিমানা আদায় করে না, ঋণগ্রহীতারা তাঁদের ঋণ পরিশোধের সময়সীমা নির্ধারণের ব্যাপারে স্বাধীন। তিনি আরো বলেন, বেশির ভাগ ঋণ গ্রহীতার একাউন্টে মোট ঋণের ৭৫ ভাগ জমা আছে, তাই তারা খুব একটা খারাপ অবস্থায় নেই’।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক এর বিশ্লেষক মোঃ আরিফুল হক বলেন, ঋণ শোধ তেমন বড় কোন ব্যাপার নয়।‘’ ব্র্যাক এর ঋণের উপর সুদের হার শতকরা ২৭ ভাগ এবং গ্রামীন ব্যাংকে এই হার শতকরা ২০ ভাগ।

ঋণ গ্রহীতাদের উপর চাপ প্রয়োগ এবং ঋণের চাপে গ্রহীতাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিক্রির অভিযোগ ও অস্বীকার করে ব্র্যাক।

জনাব হক বলেন-‘ আমাদের কাজের ক্ষেত্রে কখনোই এমন কিছু হয় না, কারণ আমরা গ্রহীতাদের উপর চাপ প্রয়োগ করি না’।

ক্ষুদ্র ঋণ খাতে হ্রাসকৃত মোট অর্থের উপর সুদ গণনা করা হয়, এর মানে হল মোট ঋণের উপর সুদ ধারণ না করে শোধ করতে থাকা অবস্থায় যে পরিমাণ ঋণের অংক বাকি থাকে, তাঁর পরিমাণের উপরে সুদ ধার্য হয়।

জনাব হক স্বীকার করেন যে, তাঁদের ৪৩ লক্ষ ঋণ গ্রহীতার এক তৃতীয়াংশ অন্য এন জি ও থেকেও ঋণ নেন। তিনি বলেন যে, ঋণ গ্রহীতারা অন্য কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিচ্ছে কিনা তা জানার কোন উপায় নেই। ব্র্যাক চেষ্টা করে ঋণ গ্রহীতাদের প্রতিবেশির সাথে কথা বলে তাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতে। গ্রামীন ব্যাংক দাবি করে তারাও এ ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে থাকে যদিও বিশ্লেষণে দেখা যায় যে এসব উদ্যোগ তেমন ফলপ্রসু হয় না।

লিভার বিক্রিঃ

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ক্ষুদ্র ঋণের ঋণ পরিশোধ কাঠামো এবং গ্রামে বসবাসরত বাংলাদেশিদের অনির্দিষ্ট আয় সমস্যা সৃষ্টি করছে।

জাপানের ইন্সটিটিউট অফ ডেভেলপিং ইকোনমিক্স এর এক সমীক্ষায় দেখা যায়, কোন কোন পরিবার তাঁদের ঘরের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে অনেক কিছু বিক্রি করে এবং মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে হলেও তাঁদের ক্ষুদ্র ঋণ এর সুদ পরিশোধ অব্যাহত রেখেছে ভবিষ্যত ঋণের আশায়।

২০০৬-২০০৭ সালে এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে, ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহীতাদের কেবলমাত্র ৭ শতাংশ দারিদ্রতা মুক্ত হতে পেরেছেন।

যদিও বিশ্বব্যাংকের এ বছর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায় ১৯৯০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশী ক্ষুদ্র ঋণের সহায়তায় দারিদ্রতা মুক্ত হয়েছে।

কিন্তু তারপরেও অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিক্রির মত ঘটনা থামছে না।

কালাই এর অদূরে অবস্থিত মোলামগারি গ্রাম। এই গ্রামের মোঃ মেহেদি হাসান(২৪) জানতেন না লিভার কি জিনিস। তাঁকে বোঝানো হয় যে তাঁর শরীরের এই অংশটা দান করলে সিঙ্গাপুরের একজন মানুষের জীবন বাঁচবে, এবং সেই সাথে তিনি ৭ লাখ টাকা পাবেন।

ঢাকার একটি প্রাইভেট হাসপাতালে অপারেশনের পর তিনি গ্রামে ফিরে আসেন, যদিও মাত্র দেড় লাখ টাকা দিয়ে তাঁকে বিদায় করা হয়। তিনি বাধ্য হন তাঁর গ্রামের বাড়ি বিক্রি করে দিতে এবং বর্তমানে বুকে তীব্র ব্যথা, দিনে ৫০-৬০ বার মূত্র ত্যাগের মত শারীরিক সমস্যার শিকার তিনি।

প্রফেসর মনিরুজ্জামান জানান, এই মানব অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ব্যবস্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সাথে যারা অঙ্গ বিক্রি করছেন, তারাও বিক্রির পরে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার শিকার হয়ে তাঁদের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন। এটি তাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থায় প্রভাব ফেলছে।

ক্ষুদ্র ঋণ অনেক মানুষের অবস্থার পরিবরতন ঘটালেও ধনী দরিদ্রের ব্যবধান বৃদ্ধির কারণে মানব অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ব্যবসা বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন, যা থামাতে এখন ই সচেতন হওয়া দরকার।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যঃ

• ডিসেম্বর ২০১১ পর্যন্ত ৩ কোটি ৪০ লাখ বাংলাদেশি ক্ষুদ্র ঋণের আওতায় এসেছেন।
• তাঁদের মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বাস করেন।
• এই খাত প্রায় ৩ ভাগ জিডিপি উন্নয়নে অবদান রাখে।
• ১৯৮২ সালে বাংলাদেশে কিডনি প্রতিস্থাপন শুরু হয়।
• ১৯৯৯ সালে আইন করে বাংলাদেশে মানব অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হয়।  

সুত্রঃ আমার ব্লগ.কম

কোন মন্তব্য নেই